শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০, ২০ সাবান, ১৪৪৫ | ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন
বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২১ ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out

মতামত

পোষাক খাতে নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও অর্থায়ন

অন্তরা জেরীন
img

বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম তৈরী পোষাক রপ্তানীকারক দেশ। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরী পোষাক শিল্প। তৈরি পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ আমাদের সমাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করেছে। ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করা এ খাতটিতে কর্মরত ৪০ লাখ শ্রমিকের অধিকাংশই  নারী। মূলতঃ গ্রামীণ দরিদ্র নারীরা যারা পূর্বে শুধুমাত্র নিজ গৃহকর্মে, অন্যের গৃহে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে  অথবা কর্মহীন বেকার জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন, সেসব নারীদের পেশাগত জীবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরী করে দেয় পোষাকশিল্প খাত। শুরুর দিকে স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরক্ষর নারীরা এ পেশায় আসলেও সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এবং এ পেশায় জড়িত জনগোষ্ঠীর পেশাগত এবং সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনের কারণে শিক্ষিত নারী পুরুষ নির্বিশেষে পোষাক শিল্পখাতের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। তাছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য এ খাতে শিক্ষিত  ও দক্ষ জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা প্রবলভাবে অনূভূত হওয়ার কারণে উদ্যোক্তা কর্তপক্ষও বিভিন্ন সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করতে আগ্রহী হচ্ছেন।  
বর্তমানে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা চার হাজার ৮৮২। এর মধ্যে দুই হাজার ৯২টি কারখানা সরাসরি রপ্তানি করে। এ ছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির কারখানা দুই হাজার ৭৯০টি। শুধু ৪০ লাখ শ্রমিক, পাঁচ হাজার উদ্যোক্তা বা ২০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির পরিসংখ্যান  দিয়ে পোশাকশিল্প, মোট দেশজ প্রবৃদ্ধিতে এর অবদান এগুলো বোঝা যায় না। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পোষাক শিল্পের অবদান বোঝার জন্য এ খাতের শুরু থেকে মূল্যায়নের প্রয়োজন। 
শুরুতে শতভাগ রপ্তানিমুখী এ শিল্প সম্পূর্ণরূপে আমদানিকৃত কাঁচামাল নির্ভর ছিল। এই নির্ভরশীলতার কারণে পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে উদ্যোক্তা /মালিকেরা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে এবং অভ্যন্তরীণভাবে কাাঁচামালের চাহিদা পূরণের দিকে নজর দিলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। স্থানীয় উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে এ খাতের সাথে সম্পৃক্ত সহযোগী শিল্পসমূহের বিকাশ ঘটায়। আস্তে আস্তে দক্ষতা বৃদ্ধি করে স্থানীয়ভাবে মানসম্পন্ন সুতা ও কাপড় উৎপাদন শুরু করে এবং নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে এসব সূতা এবং কাপড় রপ্তানিযোগ্য পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয় । তাছাড়া  কাপড় রং ও প্রক্রিয়াজাত করার পর কাপড় কেটে এবং সেলাই করে রপ্তানিযোগ্য তৈরী পোশাক  হিসেবে শিল্পপণ্যে রূপান্তরিত করার যোগ্যতাও অর্জন করেছে এ খাত। গত ১৫ বছরে এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। বিশ্বের বড় বড় পোষাক ব্রান্ডের পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে বাংলাদেশে। দ্রুত সহযোগী শিল্পসমূহ গড়ে ওঠার কারণে এ শিল্প আর আগের মতো কাঁচামাল আমদানির উপর নির্ভরশীল নয়। সম্পূরক শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে টেক্সটাইল, উইভিং, ডায়িং, ফিনিশিং, এমব্রয়ডারি, প্লাস্টিক, প্যাকেজিং, এক্সেসরিজসহ অনেক শিল্প। পাশাপাশি ব্যাংকিং, পরিবহন,শিপিং এবং ইনসিওরেন্স সেবার চাহিদাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ শিল্পের হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্ব  বাজারে পেয়েছে খুঁজে নিয়েছে নতুন স্থান। 
বাংলাদেশে উৎপাদিত পোষাকের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচরণের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হওয়ায় এ খাতের জন্য প্রয়োজ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় নীতিমালার পরিপালনের বিষয়টি উঠে এসেছে। পোষাক কারখানার কর্ম-পরিবেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের অনীহা এবং বৈসাদৃশ্য ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। বিশেষতঃ নিরাপত্তাজনিত ইস্যুতে উদ্যোক্তা এবং মালিকপক্ষের গাফিলতিতে বেশ কয়েকটি বড় ধরণের দূর্ঘটনাও ঘটেছে। যার নেতিবাচত প্রভাব এ খাতে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য পোষাক খাতের মালিকগণকে কর্ম-পরিবেশ উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সুনিশ্চিত করতে হচ্ছে- যা খুবই ইতিবাচক। কর্ম-পরিবেশে নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সামাজিক নিশ্চয়তা নিঃসন্দেহে আমাদের দেশের পোষাক খাতের গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বের কাছে বাড়বে। 
আর এসব ভাবনা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ সরকার দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোষাক শিল্পের প্রসারের লক্ষ্যে শ্রমিকের নিরাপত্তা বিধান, নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ, কার্যকর অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, মানসম্মত বেতন-ভাতা নির্ধারণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারের লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এ খাতটিকে উৎসাহিত করার জন্য রপ্তানি কর হ্রাস, স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার ২০১৯ সালে ‘প্রোগ্রাম টূ সাপোর্ট সেইফটি রেট্রফিটস এন্ড এনভায়রনমেণ্টাল আপগ্রেডেশন ইন দা বাংলাদেশ আরএমজি সেক্টর প্রোজেক্ট” শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৬৪.২৯ মিলিয়ন ইউরোর এ প্রকল্পে উন্নয়ন সংস্থা এএফডি ৫০ মিলিয়ন ইউরো ঋণ সুবিধা প্রদান করে। বাকী অর্থের যোগান দিয়েছে ইইউ, কেএফডব্লিউ, জিআইজেড এর অনুদান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল। ভবনের অগ্নি নির্বাপণ, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণে এই প্রকল্পটি চালু করা হয়। পোষাক শিল্পের মানিকগণ ব্যাংক এবং নন- ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ফান্ডটি থেকে স্বল্প সুদে ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমুহ বাংলাদেশ ব্যাংক এর সাথে অংশগ্রহণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে চুক্তিবদ্ধ হবার পর এ ফান্ড থেকে ঋণ প্রাপ্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। ২০২০ সাল পর্যন্ত ৮ টি ব্যাংক এবং ৪ টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। 
স্বল্প সুদ হার এবং আর্থিক প্রণোদনা, এ দুটি বৈশিষ্ট্যের কারণে এই ব্যতিক্রমী ফান্ডটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং পোষাক শিল্পের মালিকগণের কাছে খুব আকর্ষণীয়। এ প্রকল্পের আওতায় তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্প সুদে (সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ) ঋণ সুবিধা পাবে। অংশগ্রহণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রাক-অর্থায়ন সুবিধা পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক হতে অর্থ ছাড়ের পরই  আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ঋণগ্রহীতাকে ঋণ ছাড় করবে। এ সুবিধা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদত্ত অন্যান্য পুনঃঅর্থায়ন  প্রকল্প থেকে আলাদা। এই প্রকল্প থেকে প্রত্যেক ঋণ গ্রহীতা সর্বোচ্চ ৩ মিলিয়ন ইউরো সমমূল্যের ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। এ প্রকল্পের আওতায় ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ৩ থেকে ৫ বছর। কিন্তু বিস্তৃত পরিসরে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি স্থাপন অথবা অন্য  যে কোন সংস্কার কর্মসুচীর জন্য এ ঋণ ৭ বছর মেয়াদী হতে পারবে। মধমেয়াদী থেকে দীর্ঘমেয়াদী এ সুবিধা ফান্ডটির জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ। 
ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোষাক প্রতিষ্ঠানসমূূহের জন্যও ফান্ডটি বিশেষ ভুমিকা পালন করবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোষাক কারখানার মালিকগণ সামাজিক এবং পরিবেশগত আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়নের স্বল্পতার সম্মুখিন হয়। পুঁজি স্বল্পতা এই কারখানাগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু ব্যাংকের চলতি বাজার সুদের হার তাদের জন্য ব্যয়সাধ্য। ‘ঝজঊটচ’ শীর্ষক এ ফান্ডটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোষাক কারখানাসমূহের আর্থিক খাতে স্বল্প সুদে অন্তর্ভূক্তির একটি সুযোগ তৈরি করবে এবং এর ফলে তারাও আন্তর্জাতিক বিধিমালা পরিপালনকে নিশ্চিত করতে পারবে। ফলশ্রুতিতে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশী পোষাক শিল্পের পদচারণা বৃদ্ধি পাবে যার সামগ্রিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আমাদের অর্থনীতিতে।
 প্রকল্পটির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো যথাযথ সংস্কার কাজ সম্পাদন সাপেক্ষে আর্থিক প্রণোদনা সুবিধা প্রদান করার বিষয়টি। এ প্রকল্পের অন্যতম ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ঋণের যথাযথ ব্যবহারকরণকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ঋণ প্রস্তাব অনুযায়ী নিরাপত্তাজনিত সংস্কার কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন শেষে ১০ শতাংশ এবং পরিবেশগত উন্নয়ন সম্পর্কিত সংস্কার কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পাদন সাপেক্ষে ২০ শতাংশ হারে আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হবে। ঋণ গ্রহণকারী তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উক্ত আর্থিক প্রণোদনার মধ্যে নির্দিষ্ট আনুপাতিক হারে (৯০ অনুপাত ১০) আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হবে। তৈরি পোশাক শিল্প কারখানার মালিকগণ এ্যাকর্ড, এ্যালায়েন্স ও এনটিপিএ’তে উল্লিখিত কমপ্লায়েন্সজনিত বিষয়ে ভবনের বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নি নির্বাপক ও কাঠামোগত সংস্কারসহ কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি পরিবেশ-বান্ধব বা নিরাপত্তা জোরদার বিষয়ক বিনিয়োগের জন্য এ প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত পারটিসিপেটিং ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউট, পিটিআই-এর মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন।
এছাড়া, তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিরাপত্তা ও পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্পের আওতায় ঋণ প্রস্তাব তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরী সহায়তা প্রদান এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিনিধিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। ফলে, এ খাতের টেকসই উন্নয়ন ঘটবে, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় বাংলাদেশের  তৈরি পোশাক খাতের সম্ভাবনাকে আরও বেগবান ও টেকসই করবে। করোনাকালীন সময়ে শ্রমিকসহ সকলের স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা চিন্তা করে, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা উন্নয়নের বিষয়টিকে এই ফান্ডের আওতাধীন করা হয়েছে। এ প্রকল্পের যথাযথ ব্যবহার বাংলাদেশের পোষাক এবং বস্ত্র খাতকে বিশ্বের কাছে ’উদাহরণ’ হিসেবে প্রতিস্থাপন করবে। প্রকল্পটির সঠিক বাস্তবায়ন আমাদের পোশাক শিল্পের মানকে উন্নততর করবে -যা বিশ্বে আমাদের পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি করবে। সেজন্যে সকল প্রতিনিধি কে এগিয়ে আসতে হবে। সকলের সমন্নিত প্রচেষ্টাই এই প্রকল্পের সার্থকতা নিশ্চিত করবে। 

অন্তরা জেরীন: সহকারী অধ্যাপক
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট

 

Facebook Comment

Your Comment

আরো খবর